সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট: বাংলাদেশে গত কয়েক দশকের মধ্যে গতকাল শুক্রবার সকালের ভূমিকম্পটি ছিল সর্বোচ্চ মাত্রার এবং এর ঝাঁকুনি ছিল স্মরণকালের সর্বোচ্চ। ফলে অনেকেই মনে করতে পারেননি, সর্বশেষ কবে এমন বড় ঝাঁকুনি অনুভব করেছেন। প্রায় ২০ সেকেন্ড ধরে দুলছিল ঢাকার বড় বড় ভবন। পরে জানা যায়, ঢাকার খুব কাছেই নরসিংদীর মাধবদীতে, ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। আর মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যমতে এর মাত্রা ৫ দশমিক ৫।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলেও এর তীব্র ঝাঁকুনির কারণ উৎপত্তিস্থলের কম গভীরতা এবং রাজধানী ঢাকার একেবারেই কাছাকাছি হওয়া। তাদের মতে, দেশের ভূমিকম্পের সার্কেল (পুনরাবৃত্তি) এবং সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে সংঘটিত ভূমিকম্পগুলো বলছে, গতকালের ভূমিকম্পটি বড় ধরনের ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাঘাত (ফোর শক) হতে পারে। কারণ ভূমিকম্পের পরাঘাত (আফটার শক) যেমন আছে, তেমনি পূর্বাঘাতও আছে।
এর আগে ঢাকার দোহার উপজেলার কাছে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল, যা রাজধানীর একেবারেই কাছে। এ থেকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজধানী ঢাকায় উৎপত্তিস্থল না হলেও ঢাকার চারদিকেই রয়েছে ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দু। তাই ঢাকার জন্য বড় বিপজ্জনক বার্তা এবারের ভূমিকম্প। বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সার্কেল হিসাব করলে এরই মধ্যে ৯৫ বছর পার হয়ে গেছে। এ কারণে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বা এর কাছে বড় ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকি সময় অতিক্রম করছে।
বাংলাদেশে ভূমিকম্পের সার্কেল : ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ধরে এর সময়কাল নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ বা এই ভূখণ্ডে বড় ভূমিকম্পের মধ্যে আছে ১৭৬২ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫। এটি ‘গ্রেট আরাকান আর্থকোয়েক’ নামে পরিচিত। এর ফলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ফেনী, এমনকি কুমিল্লা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর পর ১৮৬৯ সালে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যা ‘কাছাড় ভূমিকম্প নামে পরিচিত। ১৮৮৫ সালে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প, যা বেঙ্গল আর্থকোয়েক নামে পরিচিত। যেটাকে ধরে যমুনা সেতুর নকশা করা হয়েছে। তার পর ১৮৯৭ সালে গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্প। যেটার রিখটার স্কেলের মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ১ মাত্রার। যেটাকে বলা হয় বিশ্বের বড় ভূমিকম্পের মধ্যে একটি। তা ছাড়া ১৯১৮ সালে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যেটাকে শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প নামকরণ করা হয়েছে। সবশেষ ১৯৩০ সালে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, যেটাকে ‘ধুবি ভূমিকম্প’ বলা হয়। এটাই বাংলাদেশের কাছাকাছি উৎপত্তিস্থলে ঘটে যাওয়া বড় ভূমিকম্প, যেটি ৯৫ বছর আগে ঘটে গেছে। অর্থাৎ ১০০ বছরের সময়কালের কাছাকাছি সময় অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। যেটাকে অ্যালার্মিং হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী। গতকাল ঘটে যাওয়া ৫ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পকে এই গবেষক সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখছেন। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, গতকালের ভূমিকম্প একটা ফোর শক (পূর্বাঘাত)। অর্থাৎ বড় ভূমিকম্প আসার আগে যে ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, তার অন্যতম। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের সার্কেলগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ১০০ থেকে ১২৫ বছর পরপর ঘটেছে। আর যেগুলো ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে সেগুলো ২৫০ বছর থেকে ৩০০ বছর পরে হয়েছে। অর্থাৎ ১৯৩০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের কাছাকাছি তেমন বড় ভূমিকম্প হয়নি। এর পর ৯৫ বছর পার হয়ে গেছে। অতীতের তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছেÑ অতীতের মতো বড় ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা আছে এবং শুক্রবারের ভূমিকম্প ‘বড় ভূমিকম্প’ আসার আগে যে ছোট ছোট ভূমিকম্প হয় তার সতর্ক বার্তা।
ঢাকার জন্য উদ্বেগ : বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার অদূরে ৭ মাত্রায় ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৩৫ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে। তাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহতের শঙ্কা রয়ে গেছে। তা ছাড়া এই মাত্রার ভূমিকম্প হলে ভূমিকম্পপরবর্তী উদ্ধার তৎপরতা চালানো দুরূহ হয়ে যাবে। কারণ ঢাকার অধিকাংশ এলাকার রাস্তা ৩০ ফুটের কম। বাসযোগ্য শহরের মানদণ্ড অনুযায়ী ৩০ ফুটের কম রাস্তা থাকলে সেখানে ৬ তলার ওপরে ভবন করা ঝুঁকিপূর্ণ। সেক্ষেত্রে ঢাকা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
গতকাল শুক্রবার সাড়ে ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকার কয়েক জায়গায় ভবন হেলে পড়া ও ফাটল দেখা দিয়েছে। পুরান ঢাকায় ভবনের রেলিং ভেঙে তিনজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া দেশের আরও কয়েক জায়গায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে. অপরিকল্পিত শহরের মধ্যে ঢাকা প্রথম দিকেই রয়েছে। তা ছাড়া ঢাকার চারদিকের জলাভূমি দখল করে যেভাবে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে তাতে এই শহরকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ঢাকাকে রীতিমতো মৃত্যুকূপে পরিণত করা হয়েছে। এজন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সরকারের সবগুলো সংস্থার উচিত, অতি শিগগিরই ঢাকার সব ভবন পরীক্ষা করে দেখা। যেসব ভবন বিল্ডিং ভূমিকম্প সহনশীল সেগুলোকে সবুজ ভবন, যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু মজবুতিকরণ (রেট্রোফিটিং) সম্ভব, সেগুলোকে কমলা ভবন এবং যেগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণÑ সেগুলোকে লাল ভবন চিহ্নিত করে জানিয়ে দিতে হবে। লাল ভবন মানে, সেগুলো ভেঙে নতুন করে করতে হবে। তা না হলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে ঢাকাবাসী।
রাজধানীর ঢাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, ভূমিকম্পে ঢাকা শহরে ভবন দেবে গেছে, ফাটল হয়েছে। রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রায় যে ক্ষতি হয়েছে, ৭ মাত্রার হলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যাবে, ভেঙে যাবে ভবন, হতাহত হবে। ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে এমন ভূমিকম্প হলে ২-৩ লাখ মানুষ হতহাত হবে, ঢাকা শহরের ৩৫% ভেঙে পড়ার শঙ্কা আছে, অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ ভেঙে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের কাছাকাছি ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে অনেক ভবন দেবে যাবে, ভেঙে পড়বে। ধারণা আছে, ঢাকার অদূরে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে যদি ৭ মাত্রার ভূমিকম্প তা হলে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ হতাহতের ঘটনা ঘটবে। তাই সরকারের উচিত রাজউককে দিয়ে একটা নোটিশ করা ঢাকার সবগুলো ভবন মালিক বা সংস্থাকে জানিয়ে দেওয়া যে অভিজ্ঞ লোকদের দিয়ে ভবনগুলো চেক করে গ্রীন, অরেঞ্জ এবং রেড চিহ্নিত করে দেওয়া। তাতে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ক্ষয়ক্ষতি কমানো যাবে।
অধ্যাপক আনসারী বলেন, আমেরিকা, ভারত, জাপানে ভূমিকম্পের আগে এ ধরনের ক্যাটাগরি করা হয়েছে। আমরাও এভাবে কালার কোড করে বিল্ডিংগুলোকে ট্যাগ করে, ভবনের গায়ে রং বসিয়ে দিতে পারি প্ল্যাকার্ড দিয়ে। তিনি বলেন, রানা প্লাজার পর এ বিষয়ে আমাদের দেশে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টিম করা হয়েছে। ৫০টির মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তাদের দিয়ে কাজগুলো করানো যেতে পারে।
বুয়েটের সবশেষ তথ্যমতে, ঢাকা শহরে প্রায় ২১ লাখের মতো পাকা বাড়ি আছে। তার মধ্যে ১৫ লাখ আছে একতলা থেকে দোতলার মধ্যে। আর প্রায় ৬ লাখের মতো বাড়ি রয়েছে যেগুলো ৬ তলার ঊর্ধ্বে। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ৬ তলার ওপরে সব ভবন বহুতল হিসেবে চিহ্নিত।
এ বিষয়ে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, বিএনবিসি কোড অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ করা উচিত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ঢাকা শহরে যতগুলো ভবন আছে তার মাত্র ২০% রাজউকের নিয়মতান্ত্রিক অনুমোদন নেওয়া। বাকি ৮০ শতাংশে সেভাবে বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। রাজউকের চোখের সামনে কীভাবে বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাকার আশপাশে সাভার, কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় রাজউকভুক্ত হলেও নিয়ন্ত্রণে নেই। সেখানে চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে ভবন করা। রাজউক অনুমোদন দেওয়ায় ব্যস্ত থাকে। এই সংস্থার অনুমোদনের চাইতে বেশি দরকার নিয়ন্ত্রণ করা সেটি হচ্ছে না।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, কমপক্ষে ৩০ ফুট রাস্তা না থাকলে ৬ তলার ওপরে ভবন অনুমোদন দেওয়া ঠিক না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ঢাকা শহরে অনেক জায়গায় ৮ ফুট রাস্তা, সেখানেও বহুতল করা হয়েছে। একটা ভূমিকম্প হলে মানুষ নিরাপদ আশ্রয় নেবে সেই জায়গাটুকু ঢাকায় নেই। ভূমিকম্পপরবর্তীতে উদ্ধার কাজের জন্য গাড়ি প্রবেশ করার মতো পথ নেই। এর আগে ঢাকার দোহারে উৎপত্তিস্থল ছিল, এবার নরসিংদী। অর্থাৎ ঢাকা মাঝখানে। ঢাকার জন্য এটা ভয়ঙ্কর বার্তা।
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, একটা নিরাপদ বাসযোগ্য শহর গড়তে হলে প্রতি এক কিলোমিটার দূরত্বে একটা মাঠ থাকা দরকার। ঢাকা শহরে সে রকম খোলা জায়গা বা মাঠ নেই। তার পর যেভাবে জলাশয় ভরাট করে ভবন করা হচ্ছে তাতে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। আমরা মনে করি এলিভেটেড এক্সপ্রেসের চাইতে বেশি প্রয়োজন খোলা মাঠ করা। তিনি বলেন, এখন থেকেই ব্যবস্থা নিতে পারলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে দেশবাসীকে হয়তো রক্ষা করা যাবে। তা না হলে ঢাকার ধ্বংসস্তূপ সরাতেও বহু সময় লেগে যেতে পারে। কারণ বাংলাদেশে সেই সক্ষমতার যান যন্ত্রপাতিও নাই।