ঢাকা রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২

চ্যালেঞ্জের মুখে রপ্তানি খাত

চ্যালেঞ্জের মুখে রপ্তানি খাত

সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক দেশের রপ্তানি খাতে এক রকম আতঙ্ক তৈরি করে। একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বাজারটিতে রপ্তানি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এর প্রভাবে চার মাস ধরে কমছে দেশের পণ্য রপ্তানি। বাড়তি শুল্কারোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেড়ে গেছে তৈরি পোশাকের দাম। ফলে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশটির বড় ক্রেতারা অর্ডার (ক্রয়াদেশ) কমিয়েছেন। ইউরোপের বাজারেও মন্দাবস্থা চলছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নিয়ে অস্থিরতার কারণেই রপ্তানি আয় কমছে। আগামী মাসগুলোতেও এই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। এতে অর্থনীতিতে সংকট বাড়বে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। রপ্তানি আয় কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত সহায়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসায়ীরা তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করতে চান। এ অবস্থায় ফের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের রপ্তানি খাত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেনÑ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, পণ্যের মানোন্নয়নে নজর দেওয়া, নতুন বাজারের অনুসন্ধান, সহজ শর্ত ও স্বল্প সুদের ঋণ এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে রপ্তানি খাত।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের পণ্য রপ্তানি চার মাস ধরে কমছে। গত নভেম্বরে রপ্তানি হয়েছে ৩৮৯ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য। এ রপ্তানি গত বছরের নভেম্বরের তুলনায় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম। গত বছর নভেম্বরে রপ্তানি হয়েছিল ৪১২ কোটি ডলারের পণ্য। টানা চার মাস রপ্তানি কমলেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে সামগ্রিকভাবে পণ্য রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।

শীর্ষ পাঁচ খাতের মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ছাড়া বাকিগুলোর রপ্তানি নভেম্বর মাসে কমেছে। খাতগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য ও হোম টেক্সটাইল। এ ছাড়া চামড়াবিহীন জুতা, হিমায়িত খাদ্য ও প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানিও কমেছে। দেশের তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। গত মাসে রপ্তানি হয়েছে ৮ কোটি ২৮ লাখ ডলারের পণ্য।

এ রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম। চতুর্থ শীর্ষ রপ্তানি খাত পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি গত মাসে সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৬ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পণ্য। গত বছরের নভেম্বরে রপ্তানি হয়েছে ৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের পণ্য। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৩৫ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

গত এপ্রিল মাস থেকে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল। ৩১ জুলাই বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক এড়াতে জুলাই মাসে অনেক পণ্য জাহাজীকরণ হয়েছে। স্থগিত থাকা অনেক পণ্যও রপ্তানি হয়। সে কারণে জুলাই মাসে রপ্তানি অনেক বেড়েছিল বলে মনে করেন পোশাক রপ্তানিকারকরা।

৭ আগস্ট থেকে ট্রাম্পের ঘোষিত শুল্ক কার্যকর হয়েছে বাংলাদেশে। পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ৩১ জুলাই ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য শুল্ক ঘোষণা করেন। তাতে বাংলাদেশের শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে

কমে হয় ২০ শতাংশ। প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পাল্টা শুল্ক কাছাকাছি হওয়ায় দুশ্চিন্তামুক্ত হন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের ওপর বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা আশা করেছিলেন এর সুফল বাংলাদেশ পাবে। তার লক্ষণও দেখা দিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই বাড়তি ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, উল্টো চিত্র। রপ্তানি না বেড়ে বরং কমছে।

নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, টানা চার মাস রপ্তানি আয় কমায় আমরা উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ধাক্কার প্রভাবে আমাদের পোশাক রপ্তানি কমছেই, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও প্রতিফলিত হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। কারণ, বেশিরভাগ ক্রেতাই নতুন করে কোনো অর্ডার দিচ্ছে না। তারা এখন অতিরিক্ত ২০ শতাংশ রেসিপ্রোক্যাল শুল্কের (পাল্টা শুল্ক) একটি অংশ বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

জানা গেছে, গত চার মাস ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক; যা মূলত পোশাক খাতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব, নতুন বাজার সম্প্রসারণে ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জের কারণে হচ্ছে। তবে সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানি বহুমুখী করা, পণ্যের মান উন্নয়ন, ব্যবসা সহজীকরণ এবং অপ্রচলিত বাজারে প্রবেশ ও নীতিসহায়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উপায় খুঁজছে।

এ জন্য নতুন বাজার সম্প্রসারণ বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকার বাইরে নতুন বাজার খুঁজে বের করা, যেমনÑ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকায় রপ্তানি বাড়াতে হবে। পণ্যের মান উন্নয়ন, উৎপাদন খরচ কমানো এবং সরবরাহ শৃঙ্খল সহজ করতে হবে। রপ্তানি প্রণোদনা, আর্থিক সহায়তা, ব্যবসাবন্ধব পরিবেশ তৈরি এবং অন্যান্য নীতিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে।

রপ্তানি কমে যাওয়ার বিষয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক কার্যকরের কারণে মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাকের দাম ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়িয়েছে। সেজন্য মার্কিন বাজারে পণ্যের চাহিদা কিছুটা কমে গেছে; বাজারটিতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত