সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. আনোয়ার হোসেন আলম ও ফারহানা সিদ্দীকা। দুজনই চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। চাকরি করেন একই জোনে। সরকারের চতুর্থ শ্রেণি শুরু ১৭তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত। আগের বেতন স্কেল অনুযায়ী সাকল্যে বেতন ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ দুজনের সর্বোচ্চ বেতন ধরলেও মাসে ৫০ হাজারের বেশি নয়; কিন্তু এই বেতনে চাকরি করেও আম-মোক্তার দলিলের মাধ্যমে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহরে একটি ৩ কাঠার প্লট নিয়েছেন ফারহানা সিদ্দীকা; যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। এ ছাড়া উত্তরখান মৌজায় ৪.৭৫ কাঠার একটি প্লট রয়েছে এ দম্পতির। এর বাইরে রানাভোলা মৌজায় ৫ কাঠার ওপর নির্মাণাধীন ৮তলা বাড়ি, যাত্রবাড়ীতে ২১০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ও ৬তলা বাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া আনোয়ার হোসেনের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার মাজনবাড়ি এলাকায় ছোট ছেলের নামে বাইতুর রাইয়ান নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এলাকায় আরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আনোয়ার হোসেনের অবদান রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে এই দম্পতির নামে একটি অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে দুদকের উপপরিচালক ইয়াছির আরাফাতকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করেছে সংস্থাটি। এই কমিটি ৩০ আগস্টের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নামে কোনো ধরনের প্লট-ফ্ল্যাট ও কমার্শিয়াল স্পেস থাকলে সেটা জমা দিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চিঠি দেয়।
সেই চিঠির আলোকে রাজউক থেকে ফারহানা সিদ্দীকার পূর্বাচলের প্লটটির তথ্য আমাদের সময়ের হাতে আসে। রাজউক সূত্রে জানা গেছে, প্লটটি ক্ষতিগ্রস্তদের; কিন্তু ফারহানা সিদ্দীকা মূল মালিক আবদুল জব্বার মীরের কাছ থেকে আম-মোক্তার দলিলের মাধ্যমে মালিক হয়েছেন। অর্থাৎ তিনি আবদুল জব্বারের কাছ থেকে প্লটটি কিনে নিয়েছেন; কিন্তু সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার জন্য তিনি দলিল না করে আম-মোক্তার দলিল করেছেন বলে জানা গেছে। এই প্লটের বর্তমান বাজারমূল্য দেড় কোটি টাকার ওপরে বলে জানা গেছে। ফারহানা সিদ্দীকা পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ৪৮৫৬৪ কোডের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্লটটি দখল বুঝিয়ে নিতে ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেন।
এ বিষয়ে জানতে ফারহানা সিদ্দীকার অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তাকে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দেননি। শুধু রাজউকের কর্মচারী এই কথা স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে তার স্বামী আনোয়ার হোসেনকেও তার অফিসে গিয়ে পাওয়া যায়নি। তাকে ফোনেও পাওয়া যায়নি।
পূর্বাচলের প্লট আম-মোক্তার নামা নেওয়ার পূর্বে রাজউকের কাছে নিজের চাকরির তথ্য গোপন রেখেছেন ফারহানা সিদ্দীকা। প্লট নিতে আইনগত বাধা না থাকলেও অফিসকে অবগত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজউকের কোনো কর্মচারী ক্ষতিগ্রস্ত কোটায় বা অন্য কোনোভাবে প্লট নিতে পারে কিনা জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, রাজউকের কর্মচারী হোক, আর চেয়ারম্যান হোক, সে যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা বিধিমালা অনুযায়ী প্লটপ্রাপ্তির অধিকার রাখেন, তাহলে তো প্লট নিতে বাধা নেই; কিন্তু কেউ যদি তথ্য গোপন করে বা ভুয়া তথ্য দিয়ে প্লট নিয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই দম্পতির বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগ দেন মিথিলা ফারজানা নামের একজন। অভিযোগের বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি আমাদের সময়কে বলেন, যা যা লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, সবটাই সত্য। প্রত্যেকটা অভিযোগের প্রমাণ আমার কাছে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাজউক কর্মচারী আনোয়ার হোসেন একজন দালাল। তিনি রাজউকের বিভিন্ন কাজ করে দেওয়ার নামে মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে থাকেন। আমি নিজেও একটা কাজের জন্য তার কাছে গিয়েছিলাম, একটা কাজের জন্য টাকা দিতে বাধ্য হয়েছি। সে ফাইল লুকিয়ে রাখে। শুধু আমার কাছ থেকে নয়, আরও অনেকের কাছ থেকেই তিনি টাকা নিয়ে কাজ করেন। সে রাজউকে চাকরি করলেও মূলত সে দালাল।
দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে আরও জানা যায়, রাজধানীর উত্তর-পশ্চিম যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক রোডে এই দম্পতির দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় একটি বাড়ি, যাত্রাবাড়ী ওয়াসা রোডের একটি নয়তলা ভবনের বেশিরভাগ ফ্ল্যাট এই দম্পতির।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ার-ফারহানা দম্পতি দুজনই চাকরি করেন সংস্থাটির জোন-৮ এর অধীনে। ফারহানা সিদ্দীকা চাকরি করেন রাজউকের অর্থ ও নিরীক্ষা শাখার অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে। অন্যদিকে তার স্বামী আনোয়ার হোসেন (আলম) জোন-৮ এর অফিস সহকারী। দুজনের সাকল্য বেতন ৫০ হাজারের মধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী দম্পতির কীভাবে এত অর্থ সম্পদের মালিক হয়ে উঠলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনোয়ার হোসেন আলম পূর্বাচলে প্লট কেনাবেচায় জড়িত ছিলেন। তাছাড়া রাজউকের বিভিন্ন ফাইলের তদবির করে বেড়ান।
আনোয়ার হোসেন আলম জোন-৮ এর কর্মচারী হলেও তিনি কর্মস্থলে না থেকে প্রতিদিন রাজউকের প্রধান কার্যালয়ে দালালি ও তদবিরে ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাড়ি সিরাজগঞ্জ হলেও চাকরিতে যোগদানের সময় পরিচয় দেন জামালপুর। তিনি ২০১৫ সালে অবৈধ ডলার বহনের দায়ে মিরপুর থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পূর্বাচলে প্লট দেওয়ার নামে আবুল হোসেন নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে ভুয়া দলিল করেন আনোয়ার হোসেন।