সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্টে: পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলে নিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি সভাপতি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
গতকাল রোববার বেলা ১১টার দিকে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। দখল নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুঁটকি, আচারসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা হতো।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সভাপতি আজিজ মুসুল্লি ও তার ছেলে রিয়াজ মুসুল্লির নেতৃত্বে কুয়াকাটা পৌর যুবদলের সহসভাপতি নুরে আলম শেখ, পৌর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন মিয়া, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেদোয়ানুল ইসলাম রাসেলসহ প্রায় দেড় থেকে দুই শ ব্যক্তি এ দখল প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। এ সময় ব্যবসায়ীদের মারধর করার পাশাপাশি মালামাল লুটপাটেরও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
ব্যবসায়ীরা জানান, তারা স্থানীয় বেল্লাল মোল্লার কাছ থেকে দোকানগুলো ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একই ব্যক্তিরা দোকানগুলো দখলের পাঁয়তারা করে আসছেন এবং তালা লাগান। পরে কলাপাড়া উপজেলা বিএনপি ও স্থানীয় প্রশাসন জমির কাগজপত্র দেখে বেল্লাল মোল্লাকে মালিক হিসেবে গণ্য করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা দোকান দখল নিতে গেলে তাদের মধ্যে কেউ ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে আইনি সহায়তা চান। পরে মহিপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু পুলিশকে খবর দেওয়ার অভিযোগ তুলে দোকানিদের মারধর করেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেদোয়ানুল ইসলাম রাসেলসহ অন্যরা।
শুঁটকির দোকানি রুবেল মৃধার অভিযোগ, ২০১৮ সাল থেকে তিনি স্থানীয় বেল্লাল মোল্লার কাছ থেকে স্টল ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করে আসছেন। আজ সকালে প্রায় দেড় থেকে দুই শ ব্যক্তি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তার ও অন্যান্য দোকানের মালামাল বাইরে ফেলে দিয়ে তাদের চলে যেতে বলেন। এ সময় তারা প্রতিবাদ করলে দখলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা তাদের মারধর করে দোকান থেকে জোরপূর্বক বের করে দেন।
রুবেল মৃধা বলেন, দখলের সময় তিনি নিরুপায় হয়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে মহিপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি খারাপ দেখে ব্যবসায়ীদের মালামাল নিয়ে সেখান থেকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
আচার ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, আজ সকালে স্থানীয় বিএনপির লোকজন তার ও অন্যান্য দোকান দখলে নেন। এ সময় তিনি প্রতিবাদ করলে এবং পুলিশকে খবর দেওয়ার অভিযোগ তুলে তাকে মারধর করা হয়।
মনির বলেন, ২০১৮ সাল থেকে স্থানীয় বেল্লাল মোল্লার কাছ থেকে স্টল ভাড়া নিয়ে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট এলাকায় ব্যবসা করছেন। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি মালামাল নিয়ে সরে যান।
৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন মহিপুর থানার উপপরিদর্শক মো. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে লিখিত ভাবে অভিযোগ দিতে বলেন। কিন্তু তারা লিখিত অভিযোগ দিতে অনাগ্রহী হওয়ায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।’
ব্যবসায়ীদের মারধরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘৯৯৯ নম্বরে ফোন করার পর পুলিশের একজন সদস্য সেখানে গিয়ে ভুক্তভোগীকে খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফোন করা ব্যক্তি ফোন না ধরায় স্থানীয় এক ব্যক্তি অ্যাপের মাধ্যমে মনির নামের একজনকে শনাক্ত করেন। এ সময় ক্ষিপ্ত হয়ে হয়তো মনিরকে কিছু বলা হয়ে থাকতে পারে। তবে তখন তারা সেখানে ছিলেন না।’
জমির মালিক দাবি করা বেল্লাল মোল্লার অভিযোগ, ‘উল্লেখিত জমি নিয়ে পটুয়াখালীর একটি আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। তবে একই ব্যক্তিরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সব দোকান দখলে নিয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির হস্তক্ষেপে দোকানগুলো মুক্ত করা হয়। এ ছাড়া স্থানীয় সেনাক্যাম্প, উপজেলা ভূমি অফিস ও মহিপুর থানা-পুলিশের কাছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেওয়া হলে তারা উভয় পক্ষকে স্থিতিশীল থাকার পরামর্শ দেন। অথচ এসব সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তার জমিতে থাকা ২০টি দোকানের মালামাল বাইরে ফেলে দিয়ে দোকানগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।’
অভিযোগের বিষয়ে কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সভাপতি আজিজ মুসল্লি বলেন, ‘১৬ থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত তারা আমার জমি দখল করে রেখেছে। জমি উদ্ধারের জন্য অনেকের দারস্ত হয়েছি। কিন্তু সমস্যা সমাধান হয়নি। এরপর ভাড়াটিয়াদের আমার সঙ্গে নতুন চুক্তিনামা করতে বলি। কিন্তু তারা তাও শোনেননি। পরে আজ ভাড়াটিয়াদের দোকানের মালামাল নিয়ে দোকান ছাড়তে বলার পর তারা স্বেচ্ছায় তাদের মালামাল নিয়ে চলে যায়।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. শামিম হাওলাদার বলেন, ৯৯৯ এ কল পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। কিন্তু অভিযোগকারীকে না পাওয়ায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-কুয়াকাটা- রাঙ্গাবালী) আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ওই এলাকায় উভয় পক্ষের জমি ছিল। সাগরে জমি বিলীন হওয়ার সময় একাধিক ব্যক্তি জমির মালিকানা দাবি করায় আজকের এই ঘটনা ঘটেছে।’
সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যেহেতু সেখানে জমি নেই, তাই বিষয়টির সমাধান জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে দলীয় কোনো পরিচয় নয়, মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণেই ঝামেলা হয়েছে।’