সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে শুধু আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল না; তদন্তে উঠে আসছে আর্থিক লেনদেন, অসম বন্ধুত্ব, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে বিরোধ এবং পুরনো ক্ষোভের একাধিক সূত্র। টিকটক ভিডিও তৈরি ও ছবি তোলার কথা বলে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিমকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে লালমাইয়ের সানন্দা গ্রামের গভীর জঙ্গলে হত্যার ঘটনায় এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, অপ্রতিমকে হত্যার পর তার আইফোন নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এর আড়ালে ছিল পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ এবং আরও কিছু সম্ভাব্য কারণ।
তদন্ত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন শুক্রবার দুপুরে অপ্রতিমের মোবাইলে বারবার ক্ষুদেবার্তা পাঠায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯)। দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে আসতে তাকে বলা হয়। তুহিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা টিকটকের জন্য ভিডিও করবে এবং ছবি তুলবে। এ প্রলোভনেই অপ্রতিম বাসা থেকে বের হয়। কিছুক্ষণ তার সঙ্গে ঘোরার পর তুহিন তাকে পাহাড়ি পরিবেশে টিকটক ভিডিও তৈরির কথা বলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের লালমাই সানন্দা গ্রামের গভীর জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় তাদের সঙ্গে ছিল মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫)। পরে সেখানে যোগ দেয় মো. কামরুল হাসান (১৬) ও মো. সিয়াম (১৯)।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল ফোনের দোকান ‘ইয়েস টেক’-এ কিছুদিন কাজ করে মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ। ওই সময় অপ্রতিমের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নেয় সে। পরে অপ্রতিম পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ফাহাদকে চাপ দিলে বিষয়টি নিয়ে তার মধ্যে বিরক্তি তৈরি হয়। এরপর তুহিন ও ফাহাদের যোগসাজশে অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, অপ্রতিমকে হত্যার পর তার কাছে থাকা আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স তুহিন নিয়ে যাবে এবং ফাহাদের পাওনা পাঁচ হাজার টাকা মাফ হয়ে যাবে— এমন হিসাব ছিল বলে জানা গেছে। সানন্দা গ্রামের গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে অপ্রতিমের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নেওয়ার জন্য টানাটানি করা হয়। ফোন দিতে রাজি না হলে তুহিন প্রথমে অপ্রতিমকে আঘাত করে। পরে অন্যরাও তাকে আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী আইফোনটি নিয়ে চলে যায় তুহিন।
তবে অপ্রতিম হত্যার নেপথ্যে আর্থিক লেনদেন ও আইফোনের বিষয়টির পাশাপাশি তার বন্ধুত্বের ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, অপ্রতিমের সঙ্গে বয়সে বড় কিশোর-তরুণদের অসম বন্ধুত্বের বিষয়টি তার বাবা-মা জানতেন। এসব বন্ধু নিয়মিত তাদের বাসায় যাতায়াতও করতেন। অপ্রতিমের জন্মদিনে কেক কাটার একটি ছবিতেও তাদের উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে। পরিবারের দায়িত্ব ছিল এমন অসম বন্ধুত্ব থেকে তাকে দূরে রাখা। অপ্রতিম সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী হলেও তার কয়েকজন বন্ধু ছিল তার চেয়ে তিন থেকে ছয় বছরের বড়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্য, এসব বড় বয়সী বন্ধুর সঙ্গে মেলামেশার প্রভাবে অপ্রতিমের আচরণেও পরিবর্তন এসেছিল।
অন্যদিকে, অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগমের সঙ্গে স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। একটি সূত্রের দাবি, নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কুমিল্লার স্থানীয় কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। ওই কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে ছিলেন সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯)। এ কারণে তুহিনের মধ্যে নাহিদা বেগমের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। সেই ক্ষোভ থেকেও অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে বলে ওই সূত্র ধারণা করছে। তবে এই বিষয়টির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি যোগসূত্র এখনও নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, সন্দেহজনক সব ঘটনা ও সম্ভাব্য যোগসূত্র অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার স্বার্থে আপাতত অনেক কিছু বলা যাবে না। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বড় অর্জন হলো মামলার সব আসামিকে আটক করা। পুলিশ ন্যায়বিচারের দিকেই এগোচ্ছে।
এদিকে অপ্রতিম হত্যা মামলায় সরাসরি জড়িত চার আসামির মধ্যে বয়স কম হওয়ায় মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও কামরুল হাসানকে (১৬) গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর অনুমতি দিয়েছেন আদালত। অপর দুই আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) ও মো. সিয়ামকে (১৯) কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, চার আসামিকে কুমিল্লা কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। আদালতের অনুমতি অনুযায়ী দুই কিশোর ফাহাদ ও কামরুলকে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। অপর দুই আসামি তুহিন ও সিয়াম কুমিল্লা কারাগারে থাকবে। তাদের মধ্যে সিয়াম এ মামলায় সরাসরি হত্যায় অংশ নেওয়া আসামি নয়; হত্যাকাণ্ডের তথ্য জেনেও তা গোপন রাখার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, অপ্রতিমকে হত্যার পর মামলার মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত তুহিন সিয়ামের সঙ্গে দীর্ঘ সময় আড্ডা দেন এবং তাকে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানান। বিষয়টি জানার পরও সিয়াম পুলিশকে না জানানোয় তথ্য গোপনের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। এরপর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাকে না পেয়ে তার বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশের লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকার জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম ছিল ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে।