সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট: তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ জটিল আকার নিয়েছে। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, চাকরির নিরাপত্তা, ছাঁটাই বন্ধ ও চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহালসহ বিভিন্ন দাবিতে সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও ভাঙচুর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গতকাল সোমবার এসব অঞ্চলের প্রায় ৪০০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এতে একদিকে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশ সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এ অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের পরিবর্তে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া কিংবা পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে শুধু পোশাকশিল্প নয়, দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করার দাবির পাশাপাশি আন্দোলনের নামে সহিংসতা, ভাঙচুর এবং রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় শ্রমিক-মালিকের স্বার্থ রক্ষা, উৎপাদন সচল রাখা এবং রপ্তানি বাজার ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল সোমবার শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলে ২৬৪টি এবং গাজীপুরে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন কয়েকটি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। শিল্প পুলিশের হিসাবে, সংঘর্ষে ১২ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছেন।
শ্রমিকদের ক্ষোভের কারণ মজুরি ও চাকরির নিরাপত্তা : শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে মজুরি বাড়েনি। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ এই বেতনে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এর পাশাপাশি শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতি, অন্য কারখানায় চাকরি পেতে বাধা দিতে কালো তালিকাভুক্ত করা এবং ইচ্ছামতো ছাঁটাইয়ের অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের দাবি, শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিক প্রতিনিধিদের বক্তব্য, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণ না করলে অসন্তোষ কমবে না। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার বলেছেন, শ্রমিকদের যথাযথ মজুরি দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিয়ে মালিকদের আলোচনা করা উচিত। শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মালিকদের উদ্বেগ, উৎপাদন ও রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা : অন্যদিকে পোশাকশিল্প মালিকদের বক্তব্য, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মজুরির প্রয়োজনীয়তা তারা উপলব্ধি করেন। তবে বর্তমান বৈশি^ক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শিল্পটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ¦ালানিসংকট, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা আর্থিক চাপে রয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানিয়েছেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় মালিকেরা উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারেন মালিকরা। তিনি শ্রমিক সংগঠন ও ফেডারেশনগুলোকে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শ্রমিক ও মালিক- উভয় পক্ষের জন্য আইন সমানভাবে প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ মালিকেরাও উপলব্ধি করেন। তবে বৈশ্বিক বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার সক্ষমতা ধরে রাখতে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
আলোচনায় সমাধানের উদ্যোগ : শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ছয় সদস্যের নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এতে শ্রমিক, মালিক, সরকার ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিরা রয়েছেন। বোর্ডকে পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা ও সুপারিশ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিতে বহুমুখী ঝুঁকি : বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। ফলে শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, ব্যাংকিং খাত, পরিবহন, বন্দর ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ও পড়বে।
রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া কিংবা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, রবিবার মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহসহ পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে ৫২৯টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সোমবারের আরেক হিসাবে বিজিএমইএ জানিয়েছে, দেশের পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে ৬৭০টি কারখানা বন্ধ ছিল। এটি শুধু সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের হিসাব নয়।
সমঝোতাই সংকট উত্তরণের পথ : শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন কিংবা কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
প্রয়োজন শ্রমিক, মালিক, সরকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপ। মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো ঘোষণা, অন্যায়ভাবে ছাঁটাই বন্ধ, কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগ তদন্ত এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। কারণ শ্রমিক ও মালিক- উভয় পক্ষের স্বার্থই এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন এবং শিল্পের সক্ষমতা রক্ষা- দুটিই নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও শ্রমিকনেত্রী নাজমা আক্তার বলেছেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে বিভিন্ন স্থানে যে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই। এসব কর্মকা-ের পেছনে বহিরাগত ও স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন রয়েছে।
নাজমা আক্তার বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু আন্দোলনের নামে কোথাও কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও উৎপাদন বন্ধের মতো ঘটনা ঘটছে। এতে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন শ্রমিকরাই। তিনি আরও বলেন, কোথাও কারখানা বন্ধ থাকা কিংবা বেতন না পাওয়ার অজুহাতে কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালানো হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকা- কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিকদের নাম ব্যবহার করে নাশকতা ও শিল্পকারখানা ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এদিকে তৃতীয় পক্ষের উসকানিতে পা না দিয়ে পোশাকশ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি)। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মীর আবুল কালাম আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন। এতে বলা হয়, গত কয়েক দিন ধরে পোশাকশ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন ও নতুন মজুরি নির্ধারণের দাবিতে গাজীপুর, মিরপুর ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন শ্রমিকরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ নভেম্বর সরকার ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে গেজেট প্রকাশ করেছে। মজুরি বোর্ড গঠনের পরও বিভিন্ন এলাকায় সড়কে অরাজকতা অব্যাহত থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইবিসি।