সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট: জীবন কখনো একই রকম থাকে না। কখনো স্বচ্ছলতা আসে, আবার কখনো অভাব-অনটন ঘিরে ধরে। কোনো সময় ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় নানা সম্ভাবনা, আবার কখনো অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তা মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। কারও জীবনে থাকে কর্মহীনতার কষ্ট, কারও ওপর চেপে বসে ঋণের বোঝা। কেউ সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে হিমশিম খান। আবার কারও জীবনে সবকিছু থাকার পরও যেন অপূর্ণতা থেকে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। কেউ নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করেন, আবার কেউ কেউ আল্লাহর রহমত নিয়েও নিরাশ হয়ে যান। অথচ একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি এমন হওয়া উচিত নয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা থেকে জানা যায়, জীবনের স্বচ্ছলতা যেমন আল্লাহর নিয়ামত ও পরীক্ষার অংশ, তেমনি অভাব-অনটন এবং অনিশ্চয়তাও এক ধরনের পরীক্ষা। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৫)
এই আয়াতে আল্লাহ অভাব, ক্ষুধা, সম্পদহানি ও ভয়কে পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পথও দেখিয়েছেন। তা হলো ধৈর্য ধারণ করা। আয়াতের শেষাংশে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও’।
তাই কেউ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে তার উচিত ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। অন্য কেউ বিপদে পড়লে তাকে আল্লাহর অপ্রিয় বান্দা বলে তিরস্কার করাও উচিত নয়। কারণ মানুষের প্রতিটি বিপদকে নির্দিষ্টভাবে আল্লাহর শাস্তি হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। কোনো বিপদ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা, কোনোটি মানুষের ভুলের পরিণতি, আবার কোনোটি দুনিয়ার স্বাভাবিক কার্যকারণের অংশ হতে পারে। এসবের প্রকৃত কারণ একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।
সংকটের সময় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার পাশাপাশি তাকওয়া অবলম্বন করাও জরুরি। কোনো অবস্থাতেই তাকওয়াবিরোধী কাজে জড়ানো উচিত নয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উত্স থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত : ২-৩)
এ কারণে সংকটের মুহূর্তেও হতাশ না হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অবিচল থাকতে হবে এবং হারাম থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। রিজিকে বরকত লাভ ও সংকট থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে এসব আমল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিপদের সময় আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার গুরুত্বও পবিত্র কোরআনে তুলে ধরা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাদের উপর বিপদ আসলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই। আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের উপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৬-১৫৭)
অর্থাৎ বিপদে পড়ে যে ব্যক্তি নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে আল্লাহর কাছে ফিরে যান, ধৈর্য ধারণ করেন এবং তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করেন, তিনি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভের আশা রাখতে পারেন।
একজন মুমিনের জীবনদর্শন হওয়া উচিত এমন স্বচ্ছলতা এলে অহংকার না করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং অভাব দেখা দিলে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা। এভাবে জীবনের প্রতিটি অবস্থাই আখিরাতের পুঁজি হয়ে উঠতে পারে।
হাদিস শরিফে সুহায়ব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। তার প্রতিটি কাজই কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। সে সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকরিয়া আদায় করে, আর অস্বচ্ছলতা কিংবা দুঃখ-মুসিবতে আক্রান্ত হলে ধৈর্য ধারণ করে। উভয় অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। (মুসলিম, হাদিস : ৭৩৯০)
অতএব, জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিকে আখিরাতের কল্যাণ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার চেষ্টা করা উচিত।
মহান আল্লাহ সবাইকে অভাব-অনটন ও অনিশ্চয়তা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।