সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট: নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কয়েক দিন পর সামনে এসেছে হিমালয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ চিত্র। মাত্র পাঁচ মাস আগেই হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিল কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তঃসরকারি গবেষণা ও জ্ঞানকেন্দ্র ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি)।
গত মার্চে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনে আইসিআইএমওডি জানায়, হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো আগের তুলনায় দ্রুতগতিতে গলছে। ২০০০ সালের পর থেকে বরফ গলার হার দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কিছু হিমবাহের বরফের পুরুত্ব সর্বোচ্চ ২৭ মিটার পর্যন্ত কমেছে।
আইসিআইএমওডি-এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনসহ হিমালয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, হিমবাহের এই দ্রুত ক্ষয় এশিয়ার ‘জল টাওয়ার’ হিসেবে পরিচিত হিমালয় থেকে পানি পাওয়া প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জন্য বড় ধরনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি তৈরি করছে।
নেপালের সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যার সঠিক কারণ এখনো বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা খতিয়ে দেখছেন। তবে তাদের অনেকের ধারণা, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক একটি বিষয় হলো- ৪ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় যেখানে আগে তুষারপাত হওয়ার কথা, সেখানে এখন বৃষ্টি হচ্ছে।
ভারতের দেরাদুনভিত্তিক ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির এক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণেই উচ্চ পার্বত্য এলাকায় তুষারের পরিবর্তে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এর ফলে হিমবাহ দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।
মার্চে প্রকাশিত আইসিআইএমওডি-এর ‘চেঞ্জিং ডায়নামিকস অব গ্লেসিয়ার্স ইন দ্য হিন্দুকুশ হিমালয় রিজিয়ন ফ্রম ১৯৯০ টু ২০২০’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে তাদের আনুমানিক বরফের মজুত কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ।
অন্য প্রতিবেদন ‘এইচকেএইচ গ্লেসিয়ার আউটলুক ২০২৬’ -এ ৩৮টি পর্যবেক্ষণাধীন হিমবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০০০ সালের পর হিমবাহ ক্ষয়ের হার দ্বিগুণ হয়েছে। আইসিআইএমওডি-এর ভাষায়, এর অর্থ হিমালয়ের বরফমণ্ডলের কিছু অংশ হয়তো এমন একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ টিপিং পয়েন্টের’ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে হিমবাহের পশ্চাদপসরণ আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।
তবে গবেষণায় তথ্যের ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণাধীন ৩৮টি হিমবাহের মধ্যে মাত্র সাতটি বিশ্ব হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সংস্থা (ডব্লিউজিএমএস)-এর বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ মানদণ্ড পূরণ করে। বিপুল হিমবাহ থাকা কারাকোরাম, সিকিম, জাঁস্কার ও ভুটানের মতো অঞ্চল এখনো পর্যাপ্তভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আসেনি।
নেপালের বন্যার সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধানে আইসিআইএমওডি-এর গবেষকেরা এখন উচ্চ পার্বত্য এলাকা থেকে বরফ ও পাথরের ধস নেমেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন। তাদের ধারণা, বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ লেন্দে খোলা নামের একটি জলধারায় পড়ে থাকতে পারে। এটি ভোতে কোশি নদীর একটি শাখা। ওই ধসের ফলে পানি, পলি ও বিশাল পাথর দ্রুতগতিতে নিচের দিকে নেমে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।
আইসিআইএমওডি-এর সিনিয়র ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, এই ধরনের ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তুষারের আচ্ছাদন কমে যাওয়ায় এবং হিমবাহ পিছিয়ে যাওয়ায় পাহাড়ের আরও বেশি পাথুরে ও অনুর্বর অংশ উন্মুক্ত হচ্ছে। এসব পৃষ্ঠ বেশি তাপ শোষণ করে, ফলে পাহাড়ের ঢাল আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
তার মতে, নেপালের বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে হিমবাহের পশ্চাদপসরণ, তুষারের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং পারমাফ্রস্ট অর্থাৎ দীর্ঘ সময় জমে থাকা মাটির বরফ গলে যাওয়ার বিষয়গুলো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
আইসিআইএমওডি-এর তথ্য অনুযায়ী, মেরু অঞ্চল দুটির বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফভাণ্ডার রয়েছে হিন্দুকুশ হিমালয়ে। এই অঞ্চলে ৬৩ হাজার ৭০০টিরও বেশি হিমবাহ রয়েছে, যেগুলো ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এসব হিমবাহ এশিয়ার ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থার উৎস এবং কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জীবিকার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মিটার উচ্চতার মধ্যে অবস্থিত হিমবাহ এলাকার অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতাজনিত উষ্ণায়নের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে হিমবাহ গলার প্রভাব পুরো হিমালয়ে সমান নয়। মার্চের প্রতিবেদনে আইসিআইএমওডি জানায়, পূর্ব হেংদুয়ান শান পর্বতমালায় হিমবাহের আয়তন সবচেয়ে বেশি হারে কমেছে। কিছু এলাকায় মাত্র তিন দশকে হিমবাহের আয়তন ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
অন্যদিকে, মোট আয়তনের হিসাবে সবচেয়ে বেশি হিমবাহ ক্ষয় হয়েছে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায়। হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের ৭৪ শতাংশের বেশি হিমবাহ এই তিন অববাহিকায় অবস্থিত। ফলে এসব এলাকার দ্রুত হিমবাহ ক্ষয় শুধু নেপাল নয়, পুরো দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার পানি নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার প্রকৃত কারণ তদন্তাধীন থাকলেও বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা বলছে, হিমালয়ের দ্রুত উষ্ণায়ন ও হিমবাহের পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং পানি-সংকটের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।