ঢাকা বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩
সংবাদ শিরোনামঃ

তিন কারণে কেটেছে তেলের সংকট

তিন কারণে কেটেছে তেলের সংকট

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরপরই রাজধানীতে দীর্ঘদিনের সংকটের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। যে অকটেন ও পেট্রল কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল অপ্রতুল, তা এখন প্রায় সব ফিলিং স্টেশনেই সহজলভ্য। দেড় মাসের ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে কমেছে গাড়ির দীর্ঘ সারি, স্বাভাবিক হয়েছে সরবরাহ ও সেবা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যবৃদ্ধির ফলে চাহিদা কমা, সরকারি সরবরাহ বাড়ানো এবং বিতরণ ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ এই তিন কারণের সম্মিলিত প্রভাবেই দ্রুত কাটছে সংকট।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালী, শাহবাগ, নীলক্ষেত, রমনা, ও আসাদগেটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফিলিং স্টেশনগুলোতে আর আগের মতো দীর্ঘ যানবাহনের সারি নেই। যেখানে সপ্তাহখানেক আগেও সড়কজুড়ে লাইন ছিল, সেখানে এখন সীমিত ও স্বাভাবিক সারি দেখা যাচ্ছে। গ্রাহকরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন; কোথাও নেই আগের মতো বিশৃঙ্খলা বা তাড়াহুড়ার চিত্র। তেলের দাম বৃদ্ধির পর সংকট কমে আসার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, মূল্যবৃদ্ধির ফলে অপ্রয়োজনীয় মজুদ প্রবণতা কমে গেছে। আগে যেখানে অনেক গ্রাহক ট্যাংক ফুল করে তেল নিতেন, এখন তারা প্রয়োজন অনুযায়ী ২০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছেন। এতে চাহিদার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

দ্বিতীয়ত, সরকার ঘোষিত ২০ শতাংশ সরবরাহ বৃদ্ধি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিপো থেকে তেলের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে, ফলে বাজারে জ্বালানির প্রবাহ এখন স্বাভাবিক রয়েছে।

তৃতীয়ত, মোটরসাইকেল চালকদের জন্য চালু হওয়া ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা জ্বালানি বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরিয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে লাইনে দাঁড়ানোর অনিয়ন্ত্রিত প্রবণতা কমেছে এবং সেবায় স্বচ্ছতা এসেছে। বেসরকারি চাকরিজীবী জাহিদ হাসান বলেন, ফুয়েল পাস চালুর পর তেল নেওয়ার প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ এসেছে, ভোগান্তিও কমেছে।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের সিটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ৫ থেকে ৬ জন বাইকার স্বাভাবিকভাবে সিরিয়াল দিয়ে জ্বালানি নিচ্ছেন। কেউ ৩০০ টাকা, কেউ আবার ২৫০ টাকার তেল নিচ্ছেন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে পাম্প থেকে কম তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে পরে জানা যায়, ফুয়েল পাস থাকলে সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা এবং সাধারণভাবে ৭০০ টাকা পর্যন্ত তেল নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বাইকাররা ইচ্ছাকৃতভাবে কম নিচ্ছেন।

২৫০ টাকার তেল নিতে থাকা বাইকার আব্দুল কাদির বলেন, এখন অল্প তেল নিলেই প্রয়োজন মিটছে। যেহেতু আর দীর্ঘ সিরিয়াল নেই, তাই যেকোনো সময় এসে আবার তেল নেওয়া সম্ভব। অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি তেল নেওয়ার প্রয়োজন দেখছেন না তিনি। আগে কি তিনি এত কম তেল নিতেন? এমন প্রশ্নে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ৩-৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কেউ ২৫০-৩০০ টাকার তেল নিতেন না। তার এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, দীর্ঘ লাইনের সময় মানুষ বাধ্য হয়েই বেশি তেল নিতেন, যা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সেই প্রবণতাও কমে এসেছে।

এ ছাড়া, আগে বন্ধ থাকা অনেক ফিলিং স্টেশন এখন পুনরায় চালু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু পাম্প পূর্বে সীমিত সরবরাহ দেখিয়ে তেল মজুদ রেখেছিল; মূল্যবৃদ্ধির পর সেগুলো খুলে দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বিক্রি শুরু করেছে। ফলে বাজারে জ্বালানির প্রাপ্যতা আরও বেড়েছে।

পাম্প-সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় বাজারে চাপ কমেছে। গ্রাহকরাও প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি নিচ্ছেন, ফলে দ্রুত ও নির্বিঘ্ন সেবা নিশ্চিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে স্টোরেজ ও জাহাজ মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল মজুদ রয়েছে। অকটেন ও পেট্রল নিয়েও দুশ্চিন্তা কেটে গেছে। ফলে মে মাসজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে স্বস্তিতে রয়েছে সংস্থাটি।

সব মিলিয়ে, তেলের দাম বৃদ্ধির পরই চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের সমন্বিত প্রভাবে রাজধানীর জ্বালানি সংকট দ্রুত কমে এসেছে। দীর্ঘ লাইনের অবসান, পাম্পগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং গ্রাহকদের স্বস্তিÑ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক ধারায় ফিরে এসেছে।


আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত