সময় সংবাদ লাইভ রিপার্ট: একসময় প্রায় ২০০ মিটার প্রশস্ত ছিল নড়াই নদী। কালের বিবর্তনে দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে নদীটি আজ সংকুচিত হয়ে অস্তিত্বসংকটে। এর মধ্যেই নদীর ওপর প্রায় ৯০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে তিনটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই সেতুগুলোর উচ্চতা ও নকশা কি নৌযান চলাচলের উপযোগী? প্রয়োজনীয় নৌ-চলাচল ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না? উন্নয়নের নামে নদীর ভবিষ্যৎকে সংকটে ফেলা হচ্ছে না তো?
২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আফতাবনগর ও রামপুরা-বনশ্রী এলাকার যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্যে নড়াই নদীর ওপর তিনটি সেতুর নির্মাণকাজ উদ্বোধন করে ডিএনসিসি। এর মধ্যে দুটি যানবাহন চলাচলের এবং একটি পথচারীদের জন্য নির্ধারিত। ডিএনসিসির পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, তিনটি সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ৯০ কোটি টাকা। নির্মাণকাজে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কারিগরি সহযোগিতার কথাও জানানো হয়।
কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, নাব্যতা ও নৌপথের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।নড়াই নদী কেবল একটি জলপ্রবাহ নয়; এটি রাজধানীর জলপ্রবাহ ও সম্ভাব্য নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডিএনসিসির প্রশাসকও ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বলেছিলেন, নড়াই নদীকে পুনরুদ্ধার করা গেলে রামপুরা থেকে বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীপথ ব্যবহার করে সদরঘাট ও মিরপুর পর্যন্ত নৌযাত্রী পরিবহনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।অথচ সেই সম্ভাবনার কথা বলার পর নদীর ওপর নির্মিত সেতুগুলোর উচ্চতা ও নকশা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণাধীন সেতুর উচ্চতা বড় নৌযান ও ভবিষ্যৎ নৌপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। যদি সেতুর কারণে নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো ভবিষ্যতে নদী পুনরুদ্ধারের পথেই বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকাভুক্ত নদীর ওপর সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত ও কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে নৌপথের শ্রেণি, সেতুর উচ্চতা, নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।অভিযোগ উঠেছে, প্রয়োজনীয় বিআইডব্লিউটিএর নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ না করেই সেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে ডিএনসিসির অনুমোদিত নকশা, বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন। ডিএনসিসির পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত তুরাগ নদকে জীবন্ত সত্তা বা আইনগত সত্তা ঘোষণা করেন। পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ রায়ে দেশের সব নদ-নদীকে আইনি সুরক্ষার আওতায় আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীগুলোর আইনগত অভিভাবকের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।সুতরাং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, অস্তিত্ব ও নৌ-চলাচলের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আইন, পরিবেশ ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা অপরিহার্য।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ফজলে রাব্বী সানি সময় সংবাদ লাইভ'কে বলেন আমরা সেতুর বিরোধিতা করছি না। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, নৌপথকে অকার্যকর করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জলপ্রবাহের পথ রুদ্ধ করে, তাহলে সেই উন্নয়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলাই নাগরিক দায়িত্ব।৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু যদি নদীর নাব্যতা ও নৌপথের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে, তাহলে এই ব্যয়ের সুফল ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির হিসাব কে দেবে?
তিনি আরো বলেন,নড়াই নদীকোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি সংস্থার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। নদী জনগণের সম্পদ, প্রকৃতির সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার।নড়াই নদী কারো বাপের সম্পত্তি নয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেরও নয়।
এ বিষয়ে আরেক সোস্যাল এক্টিভিস্ট ও পরিবেশবিদ আলমগীর পারভেজ সময় সংবাদ লাইভ'কে বলেন নড়াই নদীর ওপর নির্মাণাধীন তিনটি সেতুর অনুমোদিত নকশা ও উচ্চতা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।বিআইডব্লিউটিএর নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র গ্রহণ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করতে হবে।নদীর প্রকৃত সীমানা, ঐতিহাসিক প্রশস্ততা ও নৌপথের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে স্বাধীন কারিগরি ও পরিবেশগত পর্যালোচনা করতে হবে।সেতুর কারণে নৌপথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে নির্মাণকাজ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় নকশাগত পরিবর্তন আনতে হবে।নড়াই নদীর দখল, দূষণ ও সংকোচন বন্ধ করে নদীটিকে তার স্বাভাবিক প্রবাহে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরো বলেন,উন্নয়ন চাই, কিন্তু নদী ধ্বংস করে নয়। সেতু চাই, কিন্তু নৌপথ বন্ধ করে নয়। আজকের সাময়িক যোগাযোগ সুবিধার জন্য আগামী দিনের নদী ও পরিবেশকে বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।নড়াই নদীকে বাঁচাতে হবে। কারণ নদী বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচবে, বাঁচবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।