সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সাত মাসে বিভিন্ন ঘটনায় উত্তপ্ত হয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) ক্যাম্পাস। এ সময় র?্যাগিং, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারি ও সংঘর্ষ, নারী শিক্ষার্থীকে হয়রানি, আবাসিক হলে সিট দখলসহ নানা ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি হয়। এসব ঘটনায় আহত হন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। এ অবস্থায় ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাহিরে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সংঘাত থেমে থাকছে না।
হলের রুম দখল নিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ : গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের একটি রুম দখলে বাধা দেওয়ায় ছাত্রত্ব শেষ হওয়া ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমান দুই ছাত্রদল কর্মীকে মারধর করেন। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাকে তিন মাসের জন্য বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।
কুবি শিক্ষার্থীদের ওপর কিশোর গ্যাংয়ের হামলা : ৪ মার্চ কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় এলাকায় হাঁটার সময় শপিং ব্যাগের ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. হোসাইন ও ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের একই বর্ষের শিক্ষার্থী সায়েদ হাসানকে মারধর করে স্থানীয় কিশোর গ্যাং সদস্যরা। এ ঘটনার জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে ধরে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসে। পরে প্রক্টর অফিস থেকে তাদের আটক করে পুলিশ।
ছাত্রদল নেতা ও কর্মীর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ : ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে (বার্ড) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়ে বাগবিতণ্ডায় জড়ায় কুবি শাখা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক ও বর্তমান সদস্যসচিব আবুল বাশার এবং একই দলের কর্মী মো. হাসান আহমেদ হৃদয়। এ ঘটনার পর হৃদয় ও বাশার— উভয় নিরাপত্তা শঙ্কায় ভুগছেন বলে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে দলের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের হস্তক্ষেপে ঘটনার সমাধান হয়।
নারী শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্ত : ২৯ এপ্রিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে এক বহিরাগত যুবককে আটক করে প্রক্টরিয়াল বডির কাছে সোপর্দ করেন শিক্ষার্থীরা। অভিযুক্ত যুবক ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কুবি ক্যাম্পাসে এসে উত্ত্যক্ত করার সময় তাকে আটক করে শিক্ষার্থীরা। পরে লিখিত ও ভিডিও মুচলেকা নিয়ে অভিযুক্তকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বন্ধুকে মেরে রক্তাক্ত কুবি শিক্ষার্থীর : ১৭ মে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মামা হোটেলের সামনে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আকরাম চৌধুরীর ওপর হামলা করে রক্তাক্ত করে একই বিভাগের ও একই ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহপরান হোসাইন। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। ঘটনাটি এখনও সমাধান হয়নি। সিন্ডিকেট সভার এ ঘটনার সমাধান হবে বলে জানিয়েছেন প্রক্টরিয়াল বডি।
হলের সিট নিয়ে সিনিয়র-জুনিয়রের হাতাহাতি : ২৫ জুন মধ্যরাতে বিজয়-২৪ হলের সিটে ওঠাকে কেন্দ্র করে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওই রাতেই হলের সিনিয়র শিক্ষার্থীদের মধ্যস্থতায় এ ঘটনার সমাধান করা হয়।
শিক্ষার্থীকে র্যাগিংয়ের অভিযোগ : ১৬ আগস্ট অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আমির হোসেনকে রাতভর র্যাগিং ও মানসিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে একই বিভাগের সিনিয়র শিক্ষার্থী অন্তু দাশ, মো. হাসান ও সরোয়ার হোসেন রিয়াদের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। পরদিন ১৭ আগস্ট ভুক্তভোগী আমির হোসেন নিজেকে বড় ভাই পরিচয় দিয়ে অন্তু দাশকে মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন অন্তু দাশ।
দেয়ালে লেখাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ :
কাজী নজরুল ইসলাম হলের ৪০৭ নম্বর কক্ষের বাইরে লেখা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধের জেরে গত ২২ আগস্ট মধ্যরাতে মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা সমাধানের জন্য প্রভোস্ট কক্ষে আলোচনার সময় ফের সংঘর্ষ হয়। এতে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মারুফ আহমেদের মাথা ফেটে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ইলিয়াস হোসেন শুভ ও হুমায়ুন রশিদকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।
বাসে বসাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব :
৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টায় বাসের সিটে বসাকে কেন্দ্র করে এক সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে জুনিয়র শিক্ষার্থীকে থাপ্পড় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে সিনিয়র ও জুনিয়র ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে প্রক্টর অফিসে উভয়পক্ষের উপস্থিতিতে ক্যাম্পাসের স্থিতিশীল পরিবেশ রক্ষার্থে এ ঘটনা সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান হয়।
লাইব্রেরিতে উচ্চস্বরে পড়া নিয় সংঘর্ষ :
২৭ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে উচ্চস্বরে পড়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের দুপক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১০ শিক্ষার্থী আহত হন।
ওই ঘটনায় তাৎক্ষণিক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমএম শরীফুল করীম এবং প্রক্টরিয়াল বডিসহ শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ধারাবাহিক এসব সংঘর্ষের ঘটনা প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, সম্প্রতি ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে এবং বাহিরে বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে। সামনে এ ধরনের সংঘাত বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়িয়ে চলতে আমরা ইতোমধ্যে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর মধ্যে রয়েছে কোটবাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত লাটই এবং সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা। ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার এবং শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাম্পাস এরিয়ায় পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা।