ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

লাগামহীন খেলাপি ঋণ

লাগামহীন খেলাপি ঋণ

সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট: ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও বিশেষ এক্সিট পলিসিসহ খেলাপি গ্রাহকদের জন্য নানা ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তবু ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। গত বছরের শেষ দিকে কিছুটা কমে আসার পর আবারও বাড়তে শুরু করেছে খেলাপি ঋণ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে সর্বশেষ এপ্রিল থেকে জুন— এ তিন মাসে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। সবমিলে গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ আবার ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাতের জন্য খেলাপি ঋণের এই ক্রমবর্ধমান চাপ এখন শুধু কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের সমস্যা নয়; বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে, মুনাফা ও মূলধনের ওপর চাপ বাড়ে এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশই এখন খেলাপি। এর তিন মাস আগে চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে উঠেছে।

মূলত সুদ যুক্ত হওয়ার কারণে সর্বশেষ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের অঙ্ক বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং বিশেষ এক্সিট পলিসির আওতায় ঋণগ্রহীতাদের বিভিন্ন সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে সামনে খেলাপি ঋণ কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এরপর জুন প্রান্তিকে আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা যোগ হয়েছে। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ

প্রথমবারের মতো ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পরে বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার ফলে খেলাপি ঋণের অঙ্ক কিছুটা কমে আসে। তবে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যাংক খাতে সুশাসনের ঘাটতির কারণে দেশে ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ না ফেরত দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে। খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোতে তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে, যা নতুন বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র পুরোপুরি সামনে আসেনি। সব ব্যাংকের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ হলে খেলাপি ঋণের অঙ্ক আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু বিশেষ ছাড় দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তার মতে, ব্যাংক খাতে বড় ধরনের এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল না করে দ্রুত আদায়যোগ্য ঋণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে নাম-বেনামে বিতরণ করা অনেক ঋণ এখন নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন নানা উপায়ে যেসব ঋণ নিয়মিত দেখানো হয়েছিল, তার অনেকগুলোই এখন আর পরিশোধ হচ্ছে না। এ ছাড়া ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করার নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কারণেও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। যেসব ঋণ বারবার নবায়ন বা পুনর্গঠন করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো থেকেও ব্যাংকগুলো এখন প্রত্যাশিত অর্থ আদায় করতে পারছে না।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত