ঢাকা মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করছে পুলিশ

নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করছে পুলিশ

সময় সং বাদ লাইভ রিপোর্ট:  স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রস্তুতি শুরু করতে যাচ্ছে পুলিশ। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী জানুয়ারি থেকে কয়েক ধাপে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন হতে পারে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে পুলিশের জনবল, প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের প্রস্তুতির পাশাপাশি নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে দক্ষতা বাড়াতে নতুন করে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনী দায়িত্ব পেশাদারত্বের সঙ্গে পালনে দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে আগামীকাল বুধবার পুলিশের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, উদ্বোধনের পর দেশের ১১৪টি প্রশিক্ষণ ভেন্যুতে প্রায় এক মাস ধরে এ প্রশিক্ষণ চলবে। এবার প্রায় ৫০ হাজার পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যেসব সদস্য নির্বাচনী প্রশিক্ষণ নেননি, মূলত তাদেরই এবার প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে।

পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। বিশেষ করে ভোটের মাঠে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের শরীরে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। নির্বাচনের সময় পুলিশের কর্মকাণ্ড নথিবদ্ধ করা এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি কেন্দ্র থেকে পর্যবেক্ষণে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার ১ লাখ ৫২ হাজার সদস্যকে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল ১ হাজার ৭৩৫ জন মাস্টার ট্রেইনার। পরে তারাই দেশের ১১৪টি ভেন্যুতে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেন। এবারও ওই মাস্টার ট্রেইনারদের মাধ্যমে নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রশিক্ষণে নির্বাচনের আগে, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী— এই তিন পর্যায়ে পুলিশের দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হবে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, প্রশিক্ষণ মডিউলে নির্বাচনী আইন, আচরণবিধি ও ভোটার অধিকার, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশের দায়িত্ব, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, আন্তঃসংস্থা সমন্বয়, ভোটকেন্দ্রে বাহিনী মোতায়েন এবং নির্বাচনী সহিংসতা মোকাবিলার বিষয় রাখা হয়েছে। নির্বাচনের পর সহিংসতা প্রতিরোধ, জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসাসহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও পুলিশের করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

এবারের প্রশিক্ষণে অস্ত্র ও বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোন পরিস্থিতিতে অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে, কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে এবং দায়িত্ব পালনের সময় কীভাবে বডি ওর্ন ক্যামেরা পরিচালনা করতে হবে— এসব বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ জন্য প্রশিক্ষণের প্রতিটি ভেন্যুতে বডি ওর্ন ক্যামেরা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ক্যামেরাগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, সেটিও পরীক্ষা করা হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ ২৫ হাজার ৫০০ বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করেছিল। এর মধ্যে ১৫ হাজার ছিল অনলাইন এবং ১০ হাজার অফলাইন ক্যামেরা। অনলাইন ক্যামেরার মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের দৃশ্য লাইভ স্ট্রিমিং করা হয়েছিল।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, বডি ওর্ন ক্যামেরার তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ডকিং স্টেশন, সার্ভার ও ক্লাউডভিত্তিক ডেটা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি থানায় একটি করে ডকিং স্টেশন রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এসব ক্যামেরা ও ডকিং স্টেশনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পুলিশের প্রশিক্ষণে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে চাপ, শক্তি বা হস্তক্ষেপমুক্ত থেকে আইনানুগ দায়িত্ব পালন, নির্বাচনকালে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা এবং পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া গুজব ও অপপ্রচার মোকাবিলা, সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম গতকাল সোমবার আমাদের সময়কে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে ভোটের মাঠের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। এ কারণে বুধবার নির্বাচনী প্রশিক্ষণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যেসব পুলিশ সদস্য প্রশিক্ষণের বাইরে ছিলেন, তাদের এবার প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশনও। কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার রবিবার জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই ধাপভিত্তিক ইউপি নির্বাচনের পরিকল্পনা ঘোষণার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে নির্বাচন আয়োজনের সময় নির্ধারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা ও শিক্ষকদের ব্যস্ততার বিষয়টি বিবেচনায় রাখছে কমিশন। কারণ, ভোটকেন্দ্র হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের পাশাপাশি প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন মাঠপর্যায়ে আরও বিস্তৃত। দেশের প্রায় সব ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনকে ধাপে ধাপে নির্বাচনের আওতায় আনতে হবে। ফলে বিপুলসংখ্যক ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের জন্য বড় ধরনের সমন্বয় ও জনবল ব্যবস্থাপনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

পুলিশের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া গেলে দায়িত্ব পালনে ভুলের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানো হলে পুলিশের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ, প্রভাব বিস্তার এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার আশঙ্কাও থাকে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগেভাগে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়কে প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই মাঠপর্যায়ে পুলিশের প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে ভোট হলে তার আগেই প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও জনবল ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি শেষ করতে চায় পুলিশ।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা এবং ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত