সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট:নিরাপত্তার জন্য বিমানবন্দরে মালামাল পরীক্ষায় প্রতিদিনই ব্যবহার করা হচ্ছে শক্তিশালী স্ক্যানিং মেশিন। বিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এসব মেশিন পরিচালনাকারী কর্মীরা পড়ছেন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্যানারের কাছাকাছি অবস্থান করা অপারেটরদের মধ্যে ক্ষতিকর আয়নাইজিং রেডিয়েশন এক্সপোজারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পুরনো মেশিনের শিল্ডিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, রেডিয়েশন লিকেজ, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব এ ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত ও দীর্ঘমেয়াদি রেডিয়েশন বিকিরণ মানুষের কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এতে লিউকেমিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, চোখের ছানি, রক্তকণিকা কমে যাওয়া এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। গর্ভবতী কর্মীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিকিরণ ভ্রƒণের স্বাভাবিক বিকাশেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ইকুইপমেন্ট শাখার তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরটিতে যাত্রীদের কেবিন ব্যাগেজ স্ক্যানিং (সিবিএস),হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্যানিং (এইচবিএস) এবং এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেক্টর (ইটিডি) মিলিয়ে অর্ধশতাধিক ভারী স্ক্যানিং যন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে স্মিথস ডিটেকশন ও র্যাপিসক্যানের ডুয়েল ভিউ কেবিন ব্যাগেজ স্ক্যানার রয়েছে ২২টি, যার ২০টি সচল ও ২টি অকেজো। বড় লাগেজ পরীক্ষার জন্য রয়েছে আরও ২০টি এইচবিএস মেশিন (স্মিথস ডিটেকশন, র্যাপিসক্যান ও অ্যাস্ট্রোফিজিক্স), যার ১৮টি সচল ও ২টি অকেজো। এ ছাড়া বিস্ফোরক ট্রেস ডিটেক্টরে ১০টি ইটিডি মেশিন ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, সাধারণ যাত্রীরা স্বল্প সময়ের জন্য মেশিনের সামনে আসায় তাদের ঝুঁকি না থাকলেও অপারেটররা প্রতিদিন শিফট অনুযায়ী ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসব শক্তিশালী এক্স-রে বিমের কাছাকাছি দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিনের পুরনো মেশিনের সিসা-যুক্ত পর্দা (লেড কার্টেন) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, রেডিয়েশন শিল্ডিংয়ে ত্রুটি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় সরাসরি ক্ষতিকর বিকিরণ শরীরে প্রবেশ করার শঙ্কা থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহজালাল বিমানবন্দরে কর্মরত এক স্ক্যানিং অপারেটর আমাদের সময়কে বলেন, স্ক্যানিং মেশিন পরিচালনার সময় রেডিয়েশনের ঝুঁকি থাকলেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। রেডিয়েশন থেকে সুরক্ষার জন্য কোনো বিশেষ পোশাক, মাস্ক বা প্রটেকটিভ সরঞ্জাম দেওয়া হয় না। রেডিয়েশনের কারণে চোখে সমস্যা, মাথাব্যথাসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এভাবে কাজ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হলেও এখনো রেডিয়েশন থেকে সুরক্ষায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কর্মীদের এই ঝুঁকি নিরসন এবং স্ক্যানারগুলোর বিকিরণ ও নিরাপত্তা মান সরেজমিন খতিয়ে দেখতে ১১ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ পরিদর্শন টিম গঠন করেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বাপশনিক)। গত ৩০ আগস্ট বাপশনিকের ‘বিকিরণ, পরিবহন ও বর্জ্য নিরাপত্তা বিভাগ’ (বিপবনি)-এর পরিচালক ড. জাহানারা বেগমের স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ টিম গঠন করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার কমিটি ঢাকার কার্যক্রম সমাপ্ত করে।
সরেজমিন পরিদর্শন শেষে বাপশনিকের পরিচালক ড. জাহানারা বেগম জানান, বিমানবন্দরে ব্যবহৃত বিভিন্ন স্ক্যানিং মেশিনের পরিদর্শন ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পরিদর্শনের সময় কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি মেশিন আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিয়মিত লাইসেন্সিং যাচাই করা হচ্ছে। এর ওপর ভিত্তি করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, যে কোনো রেডিয়েশনেই কিছুটা ঝুঁকি থাকে, তবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় ‘ঝুঁঁকি বনাম সুবিধার’ অনুপাত বিবেচনা করে স্ক্যানিং প্রয়োজনীয়। কেবল বস্তু শনাক্তকরণের কাজে কম মাত্রার রেডিয়েশন ব্যবহৃত হয়। তবে ত্রুটিযুক্ত মেশিন থেকে বেশি রেডিয়েশন ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। তাই কর্মীদের পূর্ণ সুরক্ষা জোরদার করা উচিত।
রেডিয়েশনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ক্ষতির বিষয়ে মেডিসিন বিভাগের ডা. শাহরিয়ার আলম আমাদের সময়কে বলেন, এক্স-রে হলো শক্তিশালী আয়নাইজিং রেডিয়েশন, যা সরাসরি মানুষের কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দীর্ঘ সময় সুরক্ষাহীনভাবে এই বিকিরণের মধ্যে থাকলে লিউকেমিয়া (ব্লাড ক্যানসার), থাইরয়েড ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, অতিরিক্ত বিকিরণে প্রজনন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত এবং গর্ভবতী নারী কর্মীর ভ্রƒণের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পরিচালক (সিএনএস-মেনটেইন্যান্স) প্রকৌশলী মো. আবদুল্লাহ কায়সার জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত ও পরিদর্শন করছে; তাদের প্রক্রিয়া শেষ হলে বিস্তারিত জানা যাবে।
ন্যূনতম এক্সপোজার বজায় রাখা : বিমানবন্দরের কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলেছেন, কর্মীদের ক্ষেত্রে ‘আলার নীতি’ কার্যকর করা প্রয়োজন, যাতে অপ্রয়োজনীয় এক্স-রে শরীরে প্রবেশ না করে। মেশিন চালু থাকা অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় অবস্থান পরিহার, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং মেশিনের সিসার শিল্ডিং অক্ষত রাখতে হবে। প্রতিটি স্ক্যানারের নিয়মিত রেডিয়েশন লিকেজ ও সেফটি সার্ভে এবং নতুন মেশিন চালু বা মেরামতের পর তা পুনঃপরীক্ষা করতে হবে। নিয়মিত স্ক্যানিংয়ে যুক্ত কর্মীদের ব্যক্তিগত ডোসিমিটার সরবরাহ করে বিকিরণের মাত্রা পরিমাপ ও রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। ঝুঁকি, নিরাপদ দূরত্ব ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকে দায়িত্ব না দেওয়া উচিত হবে না। শিল্ডিং বা ইন্টারলক ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে অবিলম্বে স্ক্যানারের ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে। গর্ভবতী কর্মীদের বিশেষ সুরক্ষার জন্য কর্মীর রেডিয়েশন এক্সপোজার পুনর্মূল্যায়ন করে বিকল্প দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কর্মীদের নিয়মিত বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতায় রেখে ঝুঁকি মুল্যায়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইনের বাস্তবায়নে আইএইএ এবং বাপশনিকের নির্ধারিত জাতীয় বিধিবিধান পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।